যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি চীনসহ ছয় দেশে আম রফতানি শুরু

গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রফতানি করছে বাংলাদেশ।

গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রফতানি করছে বাংলাদেশ। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৩ টন আম পাঠানো হয়েছে। রাজধানীর কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো শুল্কমুক্ত সুবিধায় চীনেও আমের প্রথম চালান পাঠানো হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও সিইও মো. আনোয়ার হোসাইন।

রাজধানীর ফার্মগেটে বিএআরসি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘রফতানি বাড়াতে প্রকল্পের মাধ্যমে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। চাষীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কৃষি প্রণোদনা দেয়া হবে। স্বল্প মূল্যে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে কৃষকরা উন্নত জাতের আমের চারা পাবেন।’ এ সময় প্রণোদনার মাধ্যমে হর্টিকালচার সেন্টারে আমের চারা উৎপাদন বাড়াতে নির্দেশনা দেন এ উপদেষ্টা।

কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘সবারই কথা বলার জায়গা আছে, কিন্তু কৃষক ভাইদের কথা বলার কোনো জায়গা নেই। কৃষক যাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পান।’

দেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমলেও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুবাদে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে উল্লেখ করে কৃষি উপদেষ্টা বলেন, ‘আম চাষের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান বাগানে কীভাবে ফলন বাড়ানো যায় সে প্রযুক্তি ও জাত উন্নয়নে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোর দিতে হবে।’

অনুষ্ঠানে আমচাষী ও রফতানিকারকরা বাগানে আমের ব্যাগিং, প্যাকিং, পরিবহন ও প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জানালে উপদেষ্টা বিষয়গুলো সমাধানে কাজ করার আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘গুণগত মান বজায় রেখে এবার রফতানিতে রেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। আম ছাড়াও কাঁঠাল ও লিচু রফতানির দিকেও নজর দিচ্ছে সরকার।’

তিনি বলেন, ‘দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে রফতানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। কার্গো বিমানের ভাড়া কমাতে সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজমুন নাহার করিম প্রমুখ।

রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২২ সালের জুলাই থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘আজকে পাঁচ দেশে ১৩ টন আম রফতানি করা হয়েছে। এর আগে ১৫ মে থেকে ২১ দেশে ১৬৫ টন আম পাঠানো হয়েছে।’ চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত গোপালভোগ ও হিমসাগর আম রফতানি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক চীন সফরে দেশটিতে আম রফতানির পথ উন্মুক্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রথমবারের মতো চীনে আমের চালান পাঠানো হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন চীনের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এ সুবিধার আওতায় এবারই প্রথম দেশটিতে বিনা শুল্কে বাংলাদেশের আম রফতানি করা হচ্ছে।’

আম রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘চলতি বছরে আম রফতানির পরিমাণ ১০ গুণ বাড়বে। এতে দেশের আমচাষীরা ন্যায্য দাম পাবেন।’

অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘চীনের বাজারে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের আম। এটি শুধু চীন-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণই বাড়াবে না, বরং এ পদক্ষেপ বাণিজ্যের ভারসাম্য উন্নতির পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘উইন-উইন’ অবস্থা সৃষ্টি করবে। যেখানে দুই পক্ষই লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশী আম চীনা ভোক্তাদের কাছে ঠিকঠাকভাবে পৌঁছাবে এবং ভবিষ্যতে আরো অনেক উচ্চমানের বাংলাদেশী কৃষিপণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ করবে।’

রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকার উর্বর মাটিতে উৎপাদিত বাংলাদেশী আম পরিবেশসম্মত ও উচ্চমানের কৃষিপণ্য হিসেবে পরিচিত। চীনা ভোক্তাদের এটি বৈচিত্র্যময় এক বিকল্প সরবরাহ করবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করবে।’

তিনি বলেন, ‘চীনে বাংলাদেশী আমের রফতানি কেবল একটি সূচনা মাত্র। এরই মধ্যে দেশটির বাজারে বাংলাদেশী পেয়ারা ও কাঁঠালের প্রবেশ নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে বেইজিং। বাংলাদেশ থেকে কাঁচা চামড়া আমদানি নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।’ এছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে ইলিশ রফতানির প্রত্যাশাও রয়েছে বলে জানান চীনা রাষ্ট্রদূত।

ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘আশা করছি শিগগিরই আরো বেশি সংখ্যক উচ্চমানের বাংলাদেশী কৃষিপণ্য চীনের সুপার মার্কেটের তাকগুলোয় জায়গা করে নেবে, যা দুই দেশের মানুষের জন্য বাস্তবিক সুবিধা বয়ে আনবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, সমর্থন, সমতা ও উইন-উইন সহযোগিতা বজায় রাখতে চায় বেইজিং। আমরা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মতো বহুপক্ষীয় কাঠামোতে সমন্বয় ও সহযোগিতা জোরদার করব এবং দুই দেশের শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সমন্বিত উন্নয়ন ঘটাব।’

আরও